সংসারে আশ্রয় – ১/৩৬ বেদবাণী।
” এই সংসারে আশ্রয় পাইলে মুক্তির অভাব থাকে না। যথাসাধ্য কর্ম্মে সাধ্য সাধন করিয়াই গুরু কৃপার দ্বীপন হইয়া থাকে। উপাদান ভেদে শরীর গঠিত অনুসারে স্বভাব পায়, তৎদ্বারা ক্রীড়া কর্ম্ম চলিয়া থাকে। ইহার নিবৃত্তির জন্যই আশ্ৰয় প্রয়োজন হইয়া থাকে। স্বভাব অনুসারে গুরোপদিষ্ট কার্য্য যথাসাধ্য করিবেন।” – ১/৩৬ বেদবাণী। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর।
শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপরোক্ত বাণীর তাৎপর্য্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শাস্ত্রে বলে ৮৪ লক্ষ বিভিন্ন যোনিতে জনমের পর জীব অত্যন্ত পূণ্য ফল স্বরূপ মানব দেহে এ পৃথিবী অর্থাৎ সংসারে জন্ম নেয। আমরা যখন মাতৃ গর্ভে ছিলাম , তখন আমরা সবাই ভগবানের সঙ্গে কথা বলেছি এবং পৃথিবীর আলো দেখার জন্য প্রার্থনা করেছি। ভগবানেরই নাম করব বলে আমরা সবাই মাতৃগর্ভে থেকে অঙ্গীকার করেছি। তাই ভগবানের দয়ায় আমরা মনুষ্য জনম লাভ করি। পৃথিবীতে জন্ম নেওয়ার সাথে সাথে ক্যমনা বামনায় ভরপুর হয়ে আমরা ভগবানের নাম ভুলে যাই। তখন গুরুজি এসে ভুলে যাওয়া মন্ত্ৰ আমাদেরকে প্রদান করেন। এ নাম করাই আমাদের একমাত্র সার। এর থেকেই সংসারের উৎপত্তি। সংসার= সম+ সার। অর্থাৎ সর্ব জীবে দয়া প্রেম ভাব এবং এ সংসারে আশ্রয় বলতে বোঝায় – নামের আশ্ৰয়ে থাকা। আর নামের আশ্রয়ে থাকার অর্থ ভগবানের আশ্রয়ে থাকা। তাই শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর বলেছেন যে ভগবানের আশ্রয়ে থাকলে মুক্তির অভাব হয় না অর্থাৎ আমরা শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের শ্রীচরণ যুগলে সম্পূর্ণ সমর্পণ(১০০%) করতে পারলে আমাদের মুক্তি অবশ্যম্ভাবী। শ্রীগুরুর নির্দেশ অনুযায়ী যথাসাধ্য সাধ্য সাধন করতে হয় অর্থাৎ শ্রীগুরু প্রদত্ত “শ্রীনাম” ভক্তি, শ্রদ্ধা, শ্রী গুরুর প্রতি দৃঢ় অন্ধ বিশ্বাস ও নিষ্ঠা সহকারে সর্ব্বদা অহরহ অনবরত যে কোন অবস্থায় করতে করতে শ্রী গুরু কৃপার দ্বীপন অর্থাৎ প্রজ্জ্বলিত হয়ে থাকে। পরে শ্ৰীগুরু কৃপা লাভ হয়। উপাদান ভেদে আমাদের শরীর স্বভাব পায় অর্থাৎ সত্ব, রজ ও তম এ তিন উপাদান বিভিন্নতার কারণে মানুষের আচার আচরণ গঠিত হয় এবং তদনুযায়ী মানুষের এ সংসারে ক্রিরা কর্ম চলতে থাকে। এর হাত থেকে নিবৃত্তি পাওয়া অর্থাৎ মুক্তি পাওয়ার জন্যই শ্রীগুরুর অর্থাৎ ভগবানের আশ্রয় লাভের প্রয়োজন হয়ে থাকে। স্বভাব অনুযায়ী শ্রী গুরোপদিষ্ট কার্য্য যথাসাধ্য করতে হয় অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষ নিজ নিজ ভাগ্য অনুসারে এ প্রথিবীতে জন্ম নেন৷ পূর্ব জন্মগুলির সুকৃতির ফলে সহজেই এ জন্মে ভগবানের আশ্রয় লাভ করে। আবার যাদের পূর্ব জন্ম গুলির সুকৃতি অনেক কম তাদের ক্ষেত্রে ভগবানের আশ্রয় পেতে অত্যন্ত কঠোর সাধ্য সাধন করতে হয়।
উপসংহার:- আমরা পরম সৌভাগ্যবান যে আমরা ভগবান শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের আশ্রয় লাভ করেছি। তাই শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপদেশ বাণী আমাদের অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে এবং তবেই আমরা ভগবানের সংসার আশ্রয় লাভ করতে সক্ষম হব , নচেৎ পৃথিবীর সংসারে কামনা বাসনা সম্পূর্ণ ত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত বারবার জন্ম মৃত্যু বরন করতে হবে এবং মুক্তি লাভ হবে না। তাই সাধু সাবধান।
সকলকে সশ্রদ্ধ প্রনাম, আন্তরিক ভালবাসা এবং শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। জয় রাম। প্রদ্যোৎ কুমার ভৌমিক (চন্দন ভৌমিক্), সম্পাদক, শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর আশ্রম, হরিদ্বার।
শুভ অশুভ কর্ম্মই কৃষ্ণ ভক্তির বাধক – ১/৩৭ বেদবাণী।
” সংসার মায়াময়, কেবল কর্তৃত্বাভিমানেই মুগ্ধ। অহং প্রাণের বৃদ্ধিই মায়াচক্রে ভ্রমনশীলতা লাভ করে। সুখ দুঃখ যাহার যাহার ভাগ্যবশতঃই লাভ হয়। শুভ অশুভ উভয়ই কৈতব প্রধান যাহা হইতে কৃষ্ণভক্তি অন্তর্দ্ধান হইয়া থাকে। শুভ অশুভ কর্ম্মই কৃষ্ণ ভক্তির বাধক হয়। ইচ্ছা, অনিচ্ছা জীবের অধিকার নাই, গুণ চঞ্চলতার বিবর্ণ মাত্র, অবিদ্যা কারখানা। ইচ্ছাময় অর্থাৎ যখন কোন ইচ্ছাই থাকে না সেই অবস্থায় কাম গন্ধ বিন্দুমাত্রও ব্রজধামে থাকিতে পারে না, ঐ সকল অহংকারের পরিকর ধরফরানি মাত্র৷” – ১/৩৭ বেদবাণী। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর।
শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপরোক্ত বাণীর তাৎপর্য্য উপলব্ধি করতে হবে। সংসার= সম+ সার। অর্থাৎ সর্ব জীবে দয়া প্রেম ভাব, অথচ আমরা সংসারের মূল অর্থ না বুঝে সংস্যার মায়া চক্রে কেবল কর্তৃত্বাভিমানে পড়ে মুগ্ধ হয়ে হাবিডুবি খাই। অহংকার প্রাণের বৃদ্ধি হয়ে আবদ্ধ হয়ে সংসার চক্রে ভ্রম জালে জড়িয়ে পড়ি। মানুষ জানেন যে সুখ দুঃখ ভাগ্য অনুযায়ী পূর্ব নির্ধারিত। তা জানা সত্ত্বেও
মানুষ কামনা বাসনার জন্য সংসারে আবদ্ধ হয়। শুভ অশুভ দুই কৈতব প্রধান। কৈতব বলতে ছলনা বা কপটতা বোঝায়৷ তাই শুভ অশুভ বুদ্ধিতে কৃষ্ণ ভক্তি আর থাকে না অর্থাৎ অন্তৰ্ধান হয়। শুভ অশুভ কর্ম্মই কৃষ্ণ ভক্তির বাধক অর্থাৎ যতক্ষন না কামনা বাসনা ত্যাগ করা হচ্ছে ততক্ষন পর্যন্ত সত্য অর্থাৎ পরমাত্মার সংযোগ বিচ্ছিন্ন। তাই শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর বলেছেন ” সর্ব্বদা নাম করেন। নামে করিলে সত্যকে জানিতে পারিবেন।” জীবের ইচ্ছা অনিচ্ছা সম্পূর্ণ ভগবানের হাত। গুনের অর্থাৎ সত্ব, রজ ও তম গুনের চঞ্চলতার জন্য সত্য অর্থাৎ পরমাত্মাকে জানতে পারে না। তাই অবিদ্যা কারখানায় ডুবে গিয়ে বর্ণহীন হয়ে যায়। ইচ্ছাময় অর্থাৎ যখন কোন ইচ্ছাই থাকে না বলতে বোঝায় ভগবান শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরই ইচ্ছাময়। ভগবানের ক্যোন ইচ্ছাই থাকে না। কেবল ভক্তের ইচ্ছা পূরণ করেন বলে তাঁকে ভক্ত বাঞ্ছা কল্পতরু বলা হয়। তাই কোন ভক্ত শ্ৰীগুরু প্রদত্ত ” শ্রীনাম” জপ করতে করতে সেই শক্তি অর্জন করে ব্রজধামে পৌঁছলে সেই অবস্থায় ব্রজধামে কোন কাম গন্ধ বিন্দুমাত্রও থাকতে পারে না , নচেৎ ঐ সব অহংকারের পরিকর ধরফরনি মাত্র; অর্থাৎ কর্তৃত্ব অহংকরাদি বিনাশের কারণ হতে পারে।
উপসংহার:- উপরোক্ত শ্রীশ্রী রাম ঠাকুরের উপদেশ বাণীতে আমাদের এটাই শিক্ষনীয় যে আমরা শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপদেশ অমূল্য সম্পদ ভেবে তাঁর নির্দেশিত পথ শিরোধার্য মেনে অক্ষরে অক্ষরে পালন করি, নচেৎ ঘোর সংসার চক্রে কামনা বাসনায় জড়িয়ে হাবিডুবি খেতে হবে এবং তাতে মুক্তি পাওয়া যাবে না ও বারংবার জন্মমৃত্যুর জ্বালা ভোগ করতে হবে।
সকলকে সশ্রদ্ধ প্রনাম, আন্তরিক ভালবাসা এবং শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। জয় রাম। প্রদ্যোৎ কুমার ভৌমিক (চন্দন ভৌমিক্), সম্পাদক, শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর আশ্রম, হরিদ্বার।