পতিব্রত ধর্ম্ম পালনই স্বতঃসিদ্ধ কর্ত্তব্য – ১/৩৮ বেদবাণী।
” নিজ শক্তি বলের অভাব জীবের স্বতঃসিদ্ধ। কর্ত্তা হইয়া যে কোন যজ্ঞ করিতে হয় তাহা শিবহীন জানিবেন। ভূতাদি দ্বারা যজ্ঞ ভ্রষ্ট করিয়া থাকে। অতএব পতিব্রত ধর্ম্ম পালনই জীবের স্বতঃসিদ্ধ কর্ত্তব্য।” – ১/৩৮ বেদবাণী। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর।
উপরোক্ত শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপদেশ বাণীর তাৎপর্য্য উপলব্ধির উপর বিশ্লেষণ নিম্নে দেওয়া হল:-
এখানে নিজ শক্তি বলের অভাব জীবের স্বতঃসিদ্ধ বলতে বোঝায় যে জীবের কোন নিজস্ব শক্তি নেই। কেননা প্রত্যেক জীব হল যন্ত্র, কিন্তু ভগবান যন্ত্রী; আমাদের মনুষ্য জীব থেকে আরম্ভ করে সকল জীবের চালন কর্তা ভগবান। ভগবানের শক্তিতে সকল জীব বলীয়ান। তিনি চালনা না করলে আমরা একচুলও নড়তে পারব না। তাই ইহাই স্বতঃসিদ্ধ বা ধ্রুব সত্য। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরই আমাদের ভগবান এবং চালন কর্তা। আমাদের কর্তৃত্ব করার কোন অধিকার নেই। তাই কর্তা হয়ে যজ্ঞ করলে হয় শিবহীন যজ্ঞ যা অনিষ্টকারী। দক্ষ রাজা কর্তা হয়ে ভগবান শিবকে বাদ দিয়ে যজ্ঞ করতে গিয়ে যজ্ঞ পন্ড হল এবং নিজেই ভ্রষ্ট হয়ে শেষ হয়ে গেল৷ মানুষও যদি এভাবে কর্তৃত্ব করে যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে, তবে যজ্ঞ কোন দিনই সম্পন্ন হবে না। ভূতাদি দ্বারা যজ্ঞ ভ্রষ্ট হয়ে যায়, অর্থাৎ কর্তৃত্ব ও কপটতায় শয়তানের চালক হয় যার ফলে যজ্ঞ ভ্রষ্ট হয়ে যায়। আর যিনি অকর্তৃত্ব ও ভগবানের প্রতি দৃঢ় ভক্তি ভাব নিয়ে সর্ব্বদা চলেন, তার দ্বারা অনুষ্ঠিত যজ্ঞ সর্বদাই সুসম্পন্ন হয়। এ ভাবকে পতিব্রত ধর্ম পালন বলে এবং ইহাই ব্ৰুব সত্য বা স্বতঃসিদ্ধে কর্ত্তব্য। তাই ভগবানের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে এবং তাঁর শ্রীচরণ যুগলে দৃঢ় ভক্তি, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস নিয়ে সম্পূর্ণ সমর্পণ করলে যে কোন যজ্ঞই সুচারুরূপে সুসম্পন্ন হয়। এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। ইহাই স্বতঃসিদ্ধ বা ধ্রুব সত্য।
উপসংহারঃ- উপরোক্ত শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপদেশ বাণী থেকে আমাদের মূল শিক্ষনীয় এই যে শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরই আমাদের ভগবান ও চালন কর্তা। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কোন কাজই সুসম্পন্ন হয় না। তাই শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে এবং তাঁর শ্রীচরণ যুগলে দৃঢ় ভক্তি, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস নিয়ে যদি আমরা সম্পূর্ণ অর্থাৎ ১০০% সমর্পণ করি তাহলে যে কোন যজ্ঞই সুচারুরূপে সুসম্পন্ন করতে সক্ষম হব। ইহাও উল্লেখযোগ্য যে এ কলি যুগে”নাম” যজ্ঞই সর্ব্ব শ্রেষ্ঠ। এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এ স্বতঃসিদ্ধ শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের অমূল্য উপদেশ আমাদের সকলের অক্ষরে অক্ষরে পালন করা উচিৎ।
সকলকে সশ্রদ্ধ প্রনাম, আন্তরিক ভালবাসা এবং শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। জয় রাম। প্রদ্যোৎ কুমার ভৌমিক (চন্দন ভৌমিক্), সম্পাদক, শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর আশ্রম, হরিদ্বার।
নিত্য মুক্তির জন্য দশবিধ সংস্কার সম্পাদন- ১/৩৯ বেদবাণী।
” পুরুষ অভিমানী যদি সত্য সঙ্গ না করে তবে প্রত্যবায়ী হইতে হয়৷ জগতে সাহস করিয়া নিত্য মুক্তির জন্য দশবিধ সংস্কার সম্পাদন করিতে হয়। অদৃষ্টকে ভোগে বঞ্চিত করিতে নাই।” – ১/৩৯ বেদবাণী। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর।
উপরোক্ত শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপদেশ বাণীর উপলব্ধির উপর মমার্থ নীচে প্রদত্ত হলঃ-
যদি পুরুষ অভিমানী হয় এবং সত্য সঙ্গ না করে তবে তাকে প্রত্যবায়ী অর্থাৎ অপরাধী হতে হয়। এখানে পুরুষ অভিমানী বলতে বোঝায় – অনেক ক্ষেত্ৰে দেখা যায় কোন পুরুষ তার নিজের আত্ম সম্মান বা গর্ব বোধ করার জন্য অতি প্রিয় জনের কাছেও নীরবতা পালন করেন এবং মুখ খুলে কিছুই বলেন না। এখানে অতি প্রিয় জন বলতে নিজের স্ত্রীকে বোঝায়। সংসারে এ অবস্থায় থাকলে পুরুষ সত্য সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হন৷ কেননা সংসার করলে স্ত্রীর সঙ্গ পালন ও ছেলে মেয়ে নিয়ে ভরণ পোষণ করাই সত্য সঙ্গ পালন, নচেৎ ঐ পুরুষ প্রত্যবায়ী হয় অর্থাৎ অপরাধী হয়। জগতে সাহস করিয়া নিত্য মুক্তির জন্য দশবিধ সংস্কার সম্পাদন বলতে বোঝায় – হিন্দু ধর্মে মানুষের জন্ম থেকে বিবাহ পর্যন্ত পবিত্র ও সুশৃঙ্খল জীবন যাপনের জন্য ১০টি প্রধান মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান বা দশবিধ সংস্কার পালনের বিধান হিন্দু শাস্ত্রে লেখা আছে। সেগুলো হলো- গৰ্ভাধান, পুংসেবন, সীমন্তোন্নয়ন, জাতকর্ম, নামকরণ, অন্নপ্রাশন, মুন্ডন, উপনয়ন, সমাবর্তন ও বিবাহ। মুন্ডন ও উপনয়ন অবশ্যই ব্রাহ্মণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ; কিন্তু অন্য ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে যদি কেহ দশবিধ সংস্কার মেনে চলে। বর্তমান যুগে এসব বিধি প্রায় লুপ্ত হয়ে গেছে। যাক শেষ লাহনে শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর বলছেন যে অদৃষ্টকে ভোগে বঞ্চিত করিতে নাই। এর অর্থ হল – ভাগ্যে যা নির্ধারিত আছে তা ভোগ করতে হবেই। ভোগ শেষ না হলে জোর করে বঞ্চিত বা বাদ দিলে সুদে আসলে ঋণ বাড়লে পরবর্তী জন্মে ভোগ করতে হবে। কেননা ভোগ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন নিস্তার নেই এবং তাতে মুক্তি কখনও হবে না।
উপসংহার:- উপরোক্ত শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপদেশ বাণীর সাংসারিক পুরুষ যারা বিবাহ করেছেন তাদের জন্য খুবই মূল্যবান ও শিক্ষনীয় উপদেশ; অর্থাৎ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে অহংকার কর্তৃত্ব ইত্যাদি ত্যাগ করে সত্য সঙ্গ অর্থাৎ স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণ পোষণ পালন করতে হবে, নচেৎ অপরাধী বলে গন্য করা হবে। শুধু তাই নয় অদৃষ্টকে ভোগে বঞ্চিত না করে দশবিধ সংস্কার সম্পাদন করে নিত্য মুক্তির পথ তৈরী করতে হব, নচেৎ সুদে আসলে ঋণ বাড়লে বারংবার জন্ম মৃত্যু বরন করতে হবে। তাতে মুক্তির পথে ঘোরতর বাধা সৃষ্টি হবে। তাই শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের নির্দেশিত বাক্য শিরোধার্য্য মেনে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে শ্রীগুরু প্রদত্ত শ্ৰীনাম সর্ব্বদা অহরহ অনবরত যে কোন অবস্থায় দৃঢ় ভক্তি, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে এবং সেই সঙ্গে নিরপেক্ষ ভাবে উপরোক্ত দশবিধ সংস্কার সম্পূর্ণ সম্পাদন করতে সক্ষম হলে নিত্য মুক্তির পথ অবশ্যই পরিষ্কার হবে। তখনই জীবাত্মা পরমাত্মার সঙ্গে মিলন হবে এবং জন্ম মৃত্যু রহিত হবে।
সকলকে সশ্রদ্ধ প্রনাম, আন্তরিক ভালবাসা এবং শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। জয় রাম। প্রদ্যোৎ কুমার ভৌমিক (চন্দন ভৌমিক্), সম্পাদক, শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর আশ্রম, হরিদ্বার।