গুরুর আদেশকর্ম্ম পালনে যত্নশীল-১/৪২ বেদবাণী।
“প্রারব্ধ বশে আটক পড়িয়া যাহা করিতে বাধ্য হইবে তাহাতেই মধ্যস্থ থাকিতে চেষ্টা রাখিয়া গুরুর আদেশকর্ম্ম পালনে যত্নশীল হইতে চেষ্টা করিবেন৷ এই প্রকার করিতে করিতে ভগবানের শক্তি পূর্ণরূপে অধিষ্ঠান হইয়া নিত্যসেবার অধিকারী ভাবে দেহবৈগুণ্য পরিহারে সমর্থ হইতে পারিবেন৷ ভগবান সিদ্ধ অসিদ্ধ, ভাল মন্দ বিচারের অতীত, অতএব সর্ব্বদা গুরুপদ আশ্রয়ে সাধ্যানুসারে পরিচর্য্যা কার্য্যে নিত্যব্রতী থাকিবেন। অচিৱেই ভগবান উদ্ধার পদ খোলাসা করিয়া লইবেন৷” ১/৪২ বেদবাণী। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর।
উপরোক্ত শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের বাণীর গুঢ় অর্থ যা উপলব্ধি করেছি তা নিম্নে প্রদত্ত হলঃ-
এখানে প্রারব্ধ = প্রা+র+ ৰূ। প্ৰা বলতে প্রাক্তন , র বলতে রত ও ব্ধ বলতে লব্ধ ভোগ নির্ধারিত বোঝায় অর্থাৎ প্রাক্তন জনিত ভোগ নিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ভোগ একত্রিত প্রাপ্ত ভোগ নির্ধারিত। তাই প্রারব্ধ বশে আটক পড়িয়া ভাল মন্দ ভোগ যাহাই আসুক না কেন তাতে চিন্তা করে লাভ নেই। বরং মধ্যস্থ থাকিতে চেষ্টা করে শ্রীগুরুর আদেশকর্ম পালনে যত্নশীল হতে চেষ্টা করতে হয়। এভাবে ধৈর্য্য সহকারে এগিয়ে যেতে যেতে উপস্থিত যাবতীয় কর্ম সম্পন্ন করার চেষ্টা করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রীগুরু প্রদত্ত “শ্রীনাম” ভক্তি, শ্রদ্ধা, শ্রীগুরু প্রতি দৃঢ় অন্ধ বিশ্বাস রেখে ও নিষ্ঠা সহকারে সর্বদা অহরহ অনবরত যে কোন অবস্থায় জপ করতে করতে প্রারব্ধ ভোগ ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাবে এবং পরে কূল কুন্ডলিনী শক্তির জাগরণ হবে ও ভগবানের পূর্ণ শক্তির অধিষ্ঠান হয়ে নিত্য সেবার অধিকারী হতে সক্ষম হওয়া যায়। তারপর দেহের গুণের অর্থাৎ সত্ব রজ ও তম এ তিন গুণের বিভিন্নতা সম্পূর্ণ পরিহার হয়ে ত্রিগুণাতীত শক্তির জাগরণ হবে। আরো এগিয়ে গেলে সিদ্ধ অসিদ্ধ, ভাল মন্দ বিচারের অতীত হবে। সর্ব্বদা শ্রীগুরু পদ আশ্রয়ে সাধ্যানুসারে পরিচর্যা কার্য্যে নিত্য ব্রতী হতে হবে এবং পরে ভক্তি গাঢ় হলে অতি বিশুদ্ধ প্রেম হবে এবং তখন অচিরেই অর্থাৎ শীঘ্রই ভগবান উদ্ধারের পথ খোলসা করবেন এবং তখন জীবাত্মা পরমাত্মার সঙ্গে লীন হবে। শ্রী গুরু কৃপা লাভ হলে তবেই ইহা সম্ভব, নচেৎ নয়।
উপসংহার:- উপরোক্ত শ্রী শ্রী রামঠাকুরের উপদেশ বানী থেকে আমাদের শিক্ষনীয় এ যে শ্রী গুরুর আদেশ কর্ম পালনে আমাদের সর্বদা যত্নশীল হতে হবে। তাই শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে অর্থাৎ শ্রীগুরু প্রদত্ত “শ্রীনামের” মাধ্যমে শ্রীগুরুর প্রতি দৃঢ় অন্ধ বিশ্বাস রেখে শ্রদ্ধা ও ভক্তি সহকারে যদি আমরা এগিয়ে যেতে পারি তবে শ্রীগুরু কৃপায় যখন যাবতীয় কামনা বাসনা ত্যাগ হবে এবং এ জগতের সমগ্র ঋণ পরিশোধ হবে তখন এ সংসার জগৎ থেকে প্রারব্ধ বাধন মুক্ত হয়ে তাঁর নিত্য ধাম অর্থাৎ সত্যলোকে স্থান পাব।
সকলকে সশ্রদ্ধ প্রনাম, আন্তরিক ভালবাসা এবং শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। জয় রাম। প্রদ্যোৎ কুমার ভৌমিক (চন্দন ভৌমিক্), সম্পাদক, শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর আশ্রম, হরিদ্বার।
ভগবৎ সেবায় নিত্য শক্তির বিকাশ – ১/৪৩ বেদবাণী।
“ভগবৎ সেবা সর্ব্বদা করিতে করিতে নিত্য শক্তির বিকাশ হইয়া থাকে। সকল ইচ্ছার বেগ সহ্য করিতে করিতে সকল অভাব যাইয়া পূর্ণ স্বভাবে পরিণত হয়। পরের দোষ দেখিতে নাই, আপন দোষগুলির অনুসন্ধান করিয়া সর্ব্বদা দোষগুলিকে পবিত্র করিতে হয়। পরের স্বার্থজ্ঞান মলিনের কারণ হইয়া থাকে। যাহা কিছু আবির্ভূত হয় সকলি প্রারব্ধ বৃত্তি মাত্র, কাহারো কোন দোষ নাই। যাহার নিকট যে যে ঋণ পরিশোধ করার যে ভাবে ব্যবস্থা প্রাক্তনে উপস্থিত করে সেই সেই ভাবেই তাহা গ্রহন হইয়া থাকে।” – ১/৪৩ বেদবাণী। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর।
উপরোক্ত শ্ৰী শ্ৰী রাম ঠাকুরের উপদেশ উপলব্ধির উপর বিশ্লেষণ নিম্নে প্রদত্ত হলঃ-
ভগবৎ সেবা করতে করতে অর্থাৎ সর্ব্বদা অহরহ যে কোন অবস্থায় শ্রীগুরু প্রদত্ত “শ্ৰীনাম” শ্রদ্ধা ভক্তি ও নিষ্ঠা সহকারে করতে পারলে নামের সেবা হয়। এভাবে নামের সেবা করতে করতে যখন ভিতরের ময়লা সম্পূর্ণ ধৌত হয়ে পরিষ্কার হবে এবং এ জগতের কামনা বাসনা সব ত্যাগ হবে ও এ জপতের সঞ্চল ঋণ শোধ হয়ে যাবে তখন কুল কুন্ডলিনী শক্তির জাগরণ হবে এবং নিত্য শক্তির বিকাশ হবে। সকল ইচ্ছার বেগ সহ্য করতে করতে সকল অভাব দূর হয়ে পূর্ণ স্বভাবের প্রাপ্তি হবে অর্থাৎ এ অবস্থায় সত্য বস্তু গোচরে আসবে এবং ভগবান দর্শন হবে। তাই শ্রী শ্রী ঠাকুরের আমাদের প্রতি সতর্ক বাণী – পরের দোষ দেখতে নেই। আপন দোষগুলি কি কি তা নিষ্ঠা সহকারে নাম করতে করতে অনুসন্ধান করে দোষগুলিকে পবিত্র করতে হয়। পরের স্বার্থ জ্ঞানে ঈর্ষাপরায়ণ হলে নিজেরই মলিনের কারণ হয়। যা কিছু হচ্ছে তা প্রারব্ধ জনিত হয়। তাই কারও দোষ নেই। সবই নিদ্দিষ্ট অর্থাৎ পূর্ব নির্ধারিত। তাই শ্রী শ্রী ঠাকুর বলেছেন , “না লইবে কারো দোষ, না করিবে কারে রোষ, আপনি হইবে সাবধান।” প্রাক্তন জনিত যা যা ঋণ হয় তাহা পরিশোধ করার জন্য যে ভাবে ব্যবস্থা নির্দ্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত করে, তদনুযায়ী তা গৃহীত হয়। এর ব্যতিক্রম করা কারও ক্ষমতা নেই।
উপসংহারঃ- একমাত্র শ্রী গুরু প্রদত্ত শ্রীনাম ভক্তি, শ্রদ্ধা ও শ্রী গুরু প্রতি দৃঢ় অন্ধ বিশ্বাস রেখে নিষ্ঠা সহকারে জপ করতে করতে এ জগতের ঋণ সম্পূর্ণ শোধ হবে। এভাবে নামের সেবা করতে পারলে ভগবৎ সেবায় নিত্য শক্তির বিকাশ হবে। তাই শ্রীগুরু উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করাই আমাদের পরম ধর্ম।
সকলকে সশ্রদ্ধ প্রনাম, আন্তরিক ভালবাসা এবং শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। জয় রাম। প্রদ্যোৎ কুমার ভৌমিক (চন্দন ভৌমিক্), সম্পাদক, শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর আশ্রম, হরিদ্বার।
বিষ অমৃত একত্রিত হলে ভগবানের প্রেমের লক্ষণ- বেদবাণী।
” ব্রজবধূর কৃষ্ণভক্তি প্রেমের তরঙ্গে চঞ্চলই আকর্ষণ করিয়া থাকে এবং বিষ অমৃত একত্র হইয়া ভগবৎ সেবায় পূর্ণ শক্তিমান হয় বলিয়া শান্তির অভাব থাকিয়াই যায়। শান্তি হয না। ইহাই ভগবানের প্রেমের লক্ষণ জানিবেন। যেখানে শান্তির তরঙ্গ উদয় আছে সেখানে সমতাভাব হয় মাত্র কিন্তু প্রেমের অভাব থাকিয়া যায়। অতএব ভগবৎভক্ত শান্তিময় অজস্র ঐশ্চর্যকে তুচ্ছ করিয়া থাকে। মায়ামুগ্ধ বুদ্ধি কেবল শান্তির তৃপ্তি খোঁজে। ব্রজের পথে ঐহিক প্রারব্ধের কন্টক চৌদিকেতে বিকশিত হয়৷ কালের ঋণ শোধন জন্যই পতিব্রত আচরণে যত্নশীল হইয়া সতীধর্ম্ম কায়ক্লেশে ভোগান্ত করিয়া নিত্যমুক্ত ভক্তির ঊর্ব্বান করিয়া পথ রাখিয়া গিয়াছেন।” – ১/৪৫ বেদবাণী। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর।
উপরোক্ত শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপদেশ বাণী উপলব্ধির উপর বিশ্লেষণ নিম্নে বর্ণিত হলঃ-
দ্বাপর যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি গভীর ভক্তি প্রেমের তরঙ্গে ব্রজগোপীদের চঞ্চলতা আকর্ষণ করত। ব্রজগোপী গণ কৃষ্ণ ছাড়া আর কিছুই জানত না। তাই গোপীদের হৃদয়ে বিষ অমৃত একত্র হয়ে ভগবৎ সেবায় পূর্ণ শক্তিমান হত বলে শান্তির অভাব থেকে যেত৷ ইহাই প্রেমের লক্ষ্মণ। যেখানে শান্তি বিরাজ করে সেখানে কেবল সমতা ভাবের উদয় হয়’, কিন্তু প্রেমের অভাব থেকে যায়। আবার যারা ভগবানের ভক্ত, তারা শান্তিময় সকল ঐশ্চর্যকে তুচ্ছ করে থাকেন। কেননা তাদের একমাত্র লখ্য ভগবান প্রাপ্তি কি করে হয় তারই অনুসন্ধান। সাংসারিক জীবনে মায়া মুগ্ধ জীব বুদ্ধি কেবল সুখ শান্তি খোঁজেন। তাই ঐহিক সুখ সন্ধানী জীব প্রারব্ধ জনিত ভোগে জর্জরিত হয়ে ব্রজ পথের বাধা হয়ে কণ্টকাকীর্ণ অবস্থায় চারিদিকে কামনা বাসনায় ভরপুর হয়ে বিকশিত হয়। শ্রী শ্রী ঠাকুরের উপদেশের শেষ বাক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কালের ঋণ শোধনের জন্যই পতিব্রত আচরণে যত্নশীল হয়ে সতী ধর্ম্ম কায়ক্লেশে ভোগের অন্ত করে নিত্য মুক্ত ভক্তির উর্ববান করে পথ রেখে গেছেন। এখানে আমাদের বিভিন্ন জন্ম জনিত ঋণকে কালের ঋণ বোঝায়। এ ঋণ শোধনের আমাদের একটাই পথ – তা হল পতিব্রত ধর্ম্ম যত্নের সহিত আচরণ করা। ইহাই সতী ধর্ম্ম পালন অর্থাৎ সত্যের অনুশীলন। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরই আমাদের পতি। শ্রীগুরু প্রদত্ত ” শ্রীনাম” শ্রদ্ধা, ভক্তি ও নিষ্ঠা সহকারে কায়ক্লেশে অর্থাৎ সকল বাধা বিপত্তির মোকাবিলা সর্ব্বদা নিত্য অনুশীলন করতে করতে একদিন ভোগের অন্ত হবে এবং তখন সকল ঋণ শোধন হয়ে নিত্য মুক্ত ভক্তির উর্ব্বান অর্থাৎ আত্মচেতনার পথ খুলে যায় এবং তখন সত্য বস্তু গোচরে আসে।
উপসংহার:- উপরোক্ত শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপদেশ থেকে আমাদের শিক্ষণীয় এ যে শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরই আমাদের কৃষ্ণ অর্থাৎ আমাদের পতি ও ভগবান। সংসারে যতই অশান্তি আসুক না কেন আমাদের আরাধ্য শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর ও শ্রী শ্রী ঠাকুর ব্যতীত অন্য কোন ভাবনা থাকবে না। এ ভাব হল এক দিকে সাংসারিক বিষ ও অন্য দিকে হল ভগবানের অমৃত আস্বাদন এবং ইহাতে বিষ অমৃত একত্রিত হয়ে ভগবৎ সেবায় পূর্ণ শক্তিমান হয় বলে শান্তির অভাব থেকেই যায়। শান্তি হয না। ইহাই ভগবানের প্রেমের লক্ষণ, যেমন ব্রজ গোপীগণ নিজ নিজ সংসারের বাধা থাকা সত্ত্বেও শ্রী কৃষ্ণের সুমধুর বংশীর সুরের আকর্ষণে ঘর থেকে বেরিয়ে আসত। এখানে বিষ অমৃত একত্র হয়ে শান্তির অভাব হয়ে গেল। কেননা ব্রজ গোপীরা জানতেন কৃষ্ণ ছাড়া তাদের আর কেহ নেই। এ হল ভগবৎ প্রেম। তাই আমাদের এ প্ৰেম ভাব রাখতে হবে। আমাদের পতিব্রত ধর্ম্মের আচরণে যত্নশীল হয়ে এ জগতের ঋণ শোধন করতে পারলে সকল প্রারব্ধ ভোগ সমাপ্ত হলে সত্যলোকে পৌঁছলে জীব আত্মা পরমাত্মার সঙ্গে লীন হবে এবং জন্ম মৃত্যু রহিত হবে এবং নিত্যানন্দ অমৃত সুধা পান করতে সক্ষম হব। সকলকে সশ্রদ্ধ প্রনাম, আন্তরিক ভালবাসা এবং শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। জয় রাম। প্রদ্যোৎ কুমার ভৌমিক (চন্দন ভৌমিক্), সম্পাদক, শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর আশ্রম, হরিদ্বার।