বিষ অমৃত একত্রিত হলে ভগবানের প্রেমের লক্ষণ- বেদবাণী।
” ব্রজবধূর কৃষ্ণভক্তি প্রেমের তরঙ্গে চঞ্চলই আকর্ষণ করিয়া থাকে এবং বিষ অমৃত একত্র হইয়া ভগবৎ সেবায় পূর্ণ শক্তিমান হয় বলিয়া শান্তির অভাব থাকিয়াই যায়। শান্তি হয না। ইহাই ভগবানের প্রেমের লক্ষণ জানিবেন। যেখানে শান্তির তরঙ্গ উদয় আছে সেখানে সমতাভাব হয় মাত্র কিন্তু প্রেমের অভাব থাকিয়া যায়। অতএব ভগবৎভক্ত শান্তিময় অজস্র ঐশ্চর্যকে তুচ্ছ করিয়া থাকে। মায়ামুগ্ধ বুদ্ধি কেবল শান্তির তৃপ্তি খোঁজে। ব্রজের পথে ঐহিক প্রারব্ধের কন্টক চৌদিকেতে বিকশিত হয়৷ কালের ঋণ শোধন জন্যই পতিব্রত আচরণে যত্নশীল হইয়া সতীধর্ম্ম কায়ক্লেশে ভোগান্ত করিয়া নিত্যমুক্ত ভক্তির ঊর্ব্বান করিয়া পথ রাখিয়া গিয়াছেন।” – ১/৪৫ বেদবাণী। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর।
উপরোক্ত শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপদেশ বাণী উপলব্ধির উপর বিশ্লেষণ নিম্নে বর্ণিত হলঃ-
দ্বাপর যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি গভীর ভক্তি প্রেমের তরঙ্গে ব্রজগোপীদের চঞ্চলতা আকর্ষণ করত। ব্রজগোপী গণ কৃষ্ণ ছাড়া আর কিছুই জানত না। তাই গোপীদের হৃদয়ে বিষ অমৃত একত্র হয়ে ভগবৎ সেবায় পূর্ণ শক্তিমান হত বলে শান্তির অভাব থেকে যেত৷ ইহাই প্রেমের লক্ষ্মণ। যেখানে শান্তি বিরাজ করে সেখানে কেবল সমতা ভাবের উদয় হয়’, কিন্তু প্রেমের অভাব থেকে যায়। আবার যারা ভগবানের ভক্ত, তারা শান্তিময় সকল ঐশ্চর্যকে তুচ্ছ করে থাকেন। কেননা তাদের একমাত্র লখ্য ভগবান প্রাপ্তি কি করে হয় তারই অনুসন্ধান। সাংসারিক জীবনে মায়া মুগ্ধ জীব বুদ্ধি কেবল সুখ শান্তি খোঁজেন। তাই ঐহিক সুখ সন্ধানী জীব প্রারব্ধ জনিত ভোগে জর্জরিত হয়ে ব্রজ পথের বাধা হয়ে কণ্টকাকীর্ণ অবস্থায় চারিদিকে কামনা বাসনায় ভরপুর হয়ে বিকশিত হয়। শ্রী শ্রী ঠাকুরের উপদেশের শেষ বাক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কালের ঋণ শোধনের জন্যই পতিব্রত আচরণে যত্নশীল হয়ে সতী ধর্ম্ম কায়ক্লেশে ভোগের অন্ত করে নিত্য মুক্ত ভক্তির উর্ববান করে পথ রেখে গেছেন। এখানে আমাদের বিভিন্ন জন্ম জনিত ঋণকে কালের ঋণ বোঝায়। এ ঋণ শোধনের আমাদের একটাই পথ – তা হল পতিব্রত ধর্ম্ম যত্নের সহিত আচরণ করা। ইহাই সতী ধর্ম্ম পালন অর্থাৎ সত্যের অনুশীলন। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরই আমাদের পতি। শ্রীগুরু প্রদত্ত ” শ্রীনাম” শ্রদ্ধা, ভক্তি ও নিষ্ঠা সহকারে কায়ক্লেশে অর্থাৎ সকল বাধা বিপত্তির মোকাবিলা সর্ব্বদা নিত্য অনুশীলন করতে করতে একদিন ভোগের অন্ত হবে এবং তখন সকল ঋণ শোধন হয়ে নিত্য মুক্ত ভক্তির উর্ব্বান অর্থাৎ আত্মচেতনার পথ খুলে যায় এবং তখন সত্য বস্তু গোচরে আসে।
উপসংহার:- উপরোক্ত শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপদেশ থেকে আমাদের শিক্ষণীয় এ যে শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরই আমাদের কৃষ্ণ অর্থাৎ আমাদের পতি ও ভগবান। সংসারে যতই অশান্তি আসুক না কেন আমাদের আরাধ্য শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর ও শ্রী শ্রী ঠাকুর ব্যতীত অন্য কোন ভাবনা থাকবে না। এ ভাব হল এক দিকে সাংসারিক বিষ ও অন্য দিকে হল ভগবানের অমৃত আস্বাদন এবং ইহাতে বিষ অমৃত একত্রিত হয়ে ভগবৎ সেবায় পূর্ণ শক্তিমান হয় বলে শান্তির অভাব থেকেই যায়। শান্তি হয না। ইহাই ভগবানের প্রেমের লক্ষণ, যেমন ব্রজ গোপীগণ নিজ নিজ সংসারের বাধা থাকা সত্ত্বেও শ্রী কৃষ্ণের সুমধুর বংশীর সুরের আকর্ষণে ঘর থেকে বেরিয়ে আসত। এখানে বিষ অমৃত একত্র হয়ে শান্তির অভাব হয়ে গেল। কেননা ব্রজ গোপীরা জানতেন কৃষ্ণ ছাড়া তাদের আর কেহ নেই। এ হল ভগবৎ প্রেম। তাই আমাদের এ প্ৰেম ভাব রাখতে হবে। আমাদের পতিব্রত ধর্ম্মের আচরণে যত্নশীল হয়ে এ জগতের ঋণ শোধন করতে পারলে সকল প্রারব্ধ ভোগ সমাপ্ত হলে সত্যলোকে পৌঁছলে জীব আত্মা পরমাত্মার সঙ্গে লীন হবে এবং জন্ম মৃত্যু রহিত হবে এবং নিত্যানন্দ অমৃত সুধা পান করতে সক্ষম হব। সকলকে সশ্রদ্ধ প্রনাম, আন্তরিক ভালবাসা এবং শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। জয় রাম। প্রদ্যোৎ কুমার ভৌমিক (চন্দন ভৌমিক্), সম্পাদক, শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর আশ্রম, হরিদ্বার।