পতিসেবাই পরম পুরুষার্থ – বেদবাণী।
“সংসার মায়ামুগ্ধ ভ্রান্তিজনক। এই সংসারে প্রারব্ধভোগে পরিচালিত হইয়া থাকে। বাসনাকুলে বিরত হইয়া সত্য প্রতিষ্ঠার চঞ্চল হয়। কর্ম্মক্ষেত্রে সহিষ্ণুতাই সামর্থ্য প্রকৃতির উত্বৰ্তন করিয়া থাকে। প্রলোভনীয় পথে নানা উপসর্গ জুটিয়া চিত্তকে কলুষিত করিয়া লয়, তাহা হইতেই নানা উপায় অবলম্বন করিয়া জগতে অভাবগ্রস্থ হইয়া পড়ে। নানা পথে চালিত হইয়া, নানাগুণের তরঙ্ দ্বারা শান্তির অশান্তির সংঘটন করে। মুক্তি পাবে বলিয়া মায়া অর্থাৎ ভ্রান্তি যোগ আশ্রয় নিয়া যজ্ঞ ভুলিয়া যায়। যজ্ঞ শেষ করিতে পারে না। যজ্ঞ হারাইয়া নানাবিধ কাল দণ্ডের অধীন হইয়া গতাগতিময় পুনঃ পুনঃ জগতে নানারূপে সুখ দুঃখে লাঞ্ছিত হইতে দেখা যায়। স্থির বস্তুর সঙ্গ না পাইয়া, পতিসেবা হারাইয়া নানাবিধ উপায় সৃষ্টিদ্বারা কেহ সন্ন্যাসী, কেহ জাপক, কেহ যোগী, কেহ ভোগীরূপ ধারণ করিয়া আশু সুখ অনুভূতি দ্বারা সর্ব্বতোভাবে ব্যবসায়ী বুদ্ধির আবৃত হইয়া যায়। এই সকল কেবল মায়ামন্ত্র জানিবেন। সকল উদ্দেশ্যবিধান ছাড়িয়া একমাত্র পতিসেবায় নিত্য নিযুক্ত থাকিতে চেষ্টা করিবেন। বর্ত্তমানে পতিসেবাই পরম পুরুষার্থ, ইহা বই আর কিছুই নাই। ভগবৎভক্তিদেবী কোন অভাব প্রবর্ত্তন করান না, সর্ব্বদাই পবিত্র করিয়া দেন৷” – ১/৪৬ বেদবাণী। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর।
উপরোক্ত শ্ৰী শ্ৰী রাম ঠাকুরের উপদেশ উপলব্ধির উপর বিশ্লেষণ নিম্নে প্রদত্ত হলঃ-
সংসার = সম+ সার; অর্থাৎ নিরপেক্ষ থেকে সর্ব্ব জীবে সমান ভাবে প্রেম ভাব ও ভালবাসা বজায় রাখা।। তাকেই সংসার বলে। সাধারণ অর্থে সংসার মায়াময়, এর সঙ্গে জড়িত আছে কর্তৃত্ব, মান, অভিমান ইত্যাদি যাহা সবই ভ্রান্তিমূলক বা অস্থায়ী। প্রারব্ধ অর্থাৎ প্রাক্তন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ভোগ জনিত এ সংসার পরিচালিত হয়। বাসনাকুলে বিরত অর্থাৎ কামনা বাসনায় ভরপুর চঞ্চলতার জন্য সত্য প্রতিষ্ঠার ব্যাঘাত ঘটে। কর্ম্মক্ষেত্রে সহিষ্ণুতা সামর্থ প্রকৃতির উত্বৰ্তন অর্থাৎ আধ্যাত্মিক উন্নতির পরিবর্তন হয়। আবার প্রলোভনীয় পথে চললে নানা উপসর্গ এসে চিত্তকে উৎপাত করে বলে নানা উপায় অবলম্বন করতে গিয়ে মানুষ এ জগতে অভাবগ্রস্থ হয়ে পড়ে। কেননা মানুষকে প্রকৃতির গুণ অর্থাৎ সত্ব, রজ ও তম গুণের বিভিন্নতার জন্য নানা পথে পরিচালিত করে বলে শান্তি ও অশান্তির ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। মুক্তি পাওয়ার আশায় মায়া অর্থাৎ ভুল ভ্রান্তির পথ আশ্রয় নিয়ে যজ্ঞ ভুলে যায়। যজ্ঞ শেষ করতে পারে না। তাই যজ্ঞ হারিয়ে নানাবিধ কাল দণ্ডের অধীন হয়ে গতাগতিময় পুনঃ পুনঃ অর্থাৎ বারংবার জগতে বিভিন্ন ধরনের সুখ দুঃখে লাঞ্ছিত হতে দেখা যায় এবং তাতে স্থির বস্তুর সঙ্গ অর্থাৎ সত্যের সঙ্গ হারিয়ে ফেলে যার ফলে পতিসেবা অর্থাৎ ভগবানের সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে নানা রকম উপায় অবলম্বন করে দিশেহারা হয়ে যায়। তাতে কেহ সন্ন্যাসী, কেহ জাপক বা জপধারী, কেহ যোগী ও কেহ ভোগী রূপ ধারণ করে সাময়িক ভাবে সুখ অনুভব করে, কিন্তু ব্যবসায়ী বা পাটোয়ারী বুদ্ধির জন্য সত্য বস্তু গোচরে আসে না বলে বিভিন্ন ভেকধারী রূপ ধারণ করে দিশেহারা হয়ে পড়েন। ইহা সবই মায়ার খেলা। তাই নানাবিধ উদ্দেশ্য ত্যাগ করে শ্রী শ্রী ঠাকুর একমাত্র পতিসেবায় নিযুক্ত থাকিতে চেষ্টা করতে বলেছেন। শ্রী শ্রী ঠাকুরের অভয় বাণী – বর্ত্তমানে পতিসেবাই অর্থাৎ নামের সেবাই পরম পুরুষার্থ এবং ইহা ছাড়া আর কিছুই নেই। ভগবৎ ভক্তি দেবী অর্থাৎ এখানে শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরই ভগবৎ ভক্তি দেবী বা মা দূর্গা যিনি ভক্তের সকল অভাব পূরণ করেন ৷ মা জগদ্ধাত্রী বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডকে ধরে রেখেছেন। তিনি সর্ব্বদাই ভক্তদের পবিত্র করে রাখেন।
উপসংহারঃ শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের এ পত্রের উপদেশ বাণী থেকে আমাদের শিক্ষনীয় এ যে আমরা যেন পতিব্রতা ধর্ম্মকে ধরে রাখি অর্থাৎ শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরই আমাদের পতি। তাঁরই সেবায় অর্থাৎ নামের সেবায় নিজেকে সর্ব্বদা আত্ম নিয়োগ রাখাই পরম পুরুষার্থ।
সকলকে সশ্রদ্ধ প্রনাম, আন্তরিক ভালবাসা এবং শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। জয় রাম। প্রদ্যোৎ কুমার ভৌমিক (চন্দন ভৌমিক্), সম্পাদক, শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর আশ্রম, হরিদ্বার।