পুরুষকারটি পরমশক্তি – ১/৬৩ বেদবাণী।
” পুরুষকারটি পরমশক্তি, তাহাকে অজ্ঞানান্ধ জীব নানাবিধ উপচারে বিভক্ত করিয়া অভাবগ্রস্থ হইয়া পড়ে। তদ্বারা জন্ম মৃত্যু সুখ দুঃখের ফলপ্রাপ্ত লোভের বন্ধন হইতে উদ্ধার পাইতে পারে না বলিয়াই পুনঃ পুনঃ জ্বরা ব্যাধি জন্ম মৃত্যুর কবলে পতিত হয়। সুখের পিপাসায় ষড়রসে মুগ্ধ হইয়া পড়ে, শান্তির জন্য লালায়িত হইয়া কর্ত্তব্য পথ পতিব্রত পতির আশ্রয়চ্যুত হইয়া অভাবগ্রস্থ হয়। অতএব সর্ব্বধর্ম্ম পরিহারের দ্বারা পতিস্বরূপ সদাচারী অনন্য শরণাপন্ন হইবেন।” – ১/৬৩ বেদবাণী। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর।
উপরোক্ত শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপদেশ বাণীর মমার্থ নিম্নে বর্ণিত হল:-
এখানে পুরুষকার বলতে ভগবান শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরকে বোঝায়। তিনি ত্রিগুণাতীত পরম শক্তি সম্পন্ন পুরোষত্তম রাম। আমরা সাধারন জীব বলে অজ্ঞানে অন্ধ এবং অস্থায়ী নানা উপচারে/বস্তুতে প্রলোভিত হয়ে অভাবগ্রস্থ হয়ে পড়ি। ফলে পরমশক্তি অর্থাৎ সত্যবস্তুকে আমরা জানতে পারি না। তাই জন্ম মৃত্যু সুখ দুঃখের ফলপ্রাপ্ত হয়ে লোভের বন্ধন থেকে উদ্ধার পাই না বলে পুনঃ পুনঃ জ্বরা ব্যাধি জন্ম মৃত্যুর কবলে আমাদের পরতে হয়। আমরা সুখের পিপাসায় নানা জায়গায় ছুটাছুটি করি ও ষড়রসে মুগ্ধ হয়ে পরি। শুধু তাই নয়, শান্তির জন্য লালায়িত হয়ে কর্ত্তব্য পথ হারিয়ে ফেলি এবং পতিব্রত পতির আশ্রয়চ্যুত হয়ে অভাবগ্রস্থ হয়ে হাবিডুবি খাচ্ছি। এখানে আমাদের পতি শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর। আমাদের এ পতিব্রত করাই পরম লখ্য যাতে তাঁর আশ্রয়চ্যুত না হই। অতএব সর্ব্বধর্ম্ম পরিহারের দ্বারা পতিস্বরূপ সদাচারী অনন্য শরণাপন্ন হতে শ্রী শ্রী ঠাকুর আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, অর্থাৎ শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরই স্বয়ং শ্রী কৃষ্ণ। তাই শ্ৰীমদ্ভাগবৎ গীতার মোক্ষ যোগের সর্ব্বোৎকৃষ্ট শ্লোকে আছে –
” সর্বধর্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ভজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।” এখানে আমাদের উদ্দেশ্যে শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর বলছেন, “তোমরা সর্ব ধর্ম পরিহার অর্থাৎ ত্যাগ কর। পতিস্বরুপ আমি এবং কেবল অনন্য ভক্তি ভাব লইয়া আমাকে শরণ কর ও ভজনা কর। তাতে সর্ব পাপ ত্যাগ হইয়া আমার পথ নির্দেশে চইল্যা মোক্ষ লাভ করিতে সক্ষম হইব।” এটা শ্রী শ্রী ঠাকুরের উপদেশ বাণীর ভাব ধারায় উপলব্ধির উপর ব্যক্ত করলাম।
উপসংহার:- উপরোক্ত শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপদেশ থেকে আমাদের শিক্ষনীয় এই যে শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরই আমাদের পুরুষকার বা পতি। তাই সর্ব ধর্ম ত্যাগ করে শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরকে আমাদের পতিস্বরূপ ভেবে তাঁর শ্রী চরণ যুগলে ১০০% অর্থাৎ সম্পূর্ণ সমর্পণ করে শ্রী শ্রী ঠাকুরের উপদেশ বাণী অক্ষরে অক্ষরে পালন করে অর্থাৎ শ্রীগুরু প্রদত্ত “শ্রীনামের” অনুশীলনের মাধ্যমে শ্রীগুরুর প্রতি দৃঢ় অন্ধ বিশ্বাস রেখে শ্রদ্ধা ও ভক্তি এবং ধৈর্য্য সহকারে যদি আমরা পতিব্রতা ধর্ম্ম পালন করতে পারি; তবে শ্রী গুরু কৃপায় সকল বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে পুরুষকার পরমশক্তিকে জানতে পারব ও মোক্ষ লাভ করতে আমরা সক্ষম হব।
সকলকে সশ্রদ্ধ প্রনাম, আন্তরিক ভালবাসা এবং শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। জয় রাম। প্রদ্যোৎ কুমার ভৌমিক (চন্দন ভৌমিক্), সম্পাদক, শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর আশ্রম, হরিদ্বার।
মন স্বস্থানে প্রতিষ্ঠা – ১/৬৪ বেদবাণী।
” মনের স্থির করিবার বিশেষ কোন প্রয়োজন নাই। মনের স্বভাবই স্থির, কর্ত্তৃত্বাভিমান সূত্রে চঞ্চল বাসনায় আলোড়িত হইয়া নানান উপসর্গএ বণ্টন করিয়া দেয়, তাতেই লোক বিমুগ্ধ হইয়া সুখ লাভের প্রত্যাশায় নানাবিধ চেষ্টা করে বলিয়াই আরো চঞ্চল ও উপদ্রব সংযোগ হয়। পতিব্রতা ধর্ম্মকে আশ্রয় করিয়া শরণে নিমগ্ন থাকিতে অভ্যাস করিতে করিতে এবং পতি প্রতি ভক্তি রসের নিমিত্ত স্বীয় কর্ম্মজনিত অপরাধ ক্ষমা প্রার্থনা করিতে করিতে এবং চঞ্চল কার্য্য যে সকল প্রকৃতির সঙ্গ হয় সেই প্রকৃতির ভাবের নিকট হইতে দূরে থাকিবার চেষ্টা করিতে করিতে চিত্ত সঙ্কোচ হয়, পরে মন স্বস্থানে প্রতিষ্ঠা হইয়া থাকে। তাহাতে সযোগ সুখ অপেক্ষা বেশী সুখ হয়।” – ১/৬৪ বেদবাণী। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর।
উপরোক্ত শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপদেশ বাণীর মর্মার্থ নিম্নে বর্ণিত হল:-
শ্রী শ্রী ঠাকুর বলছেন যে মন স্থির করার কোন প্রয়োজন নেই। কেননা মনেতে নানা জল্পনা কল্পনা, পাপ, তাপ ইত্যাদি হতে থাকে। ইহা মনের স্বভাব। কর্তৃত্বাভিমান থাকার দরুণ মন চঞ্চল হয়ে নানা কামনা বাসনায় আলোড়িত হয়। এ সব উপসৰ্গ এসে মন নানাদিকে ভাগ বাটোয়ারাতে ব্যতিব্যন্ত করে তোলে। তাতেই লোক বিমুগ্ধ অর্থাৎ খুব খুশী হয়ে সুখ লাভের আশায় নানাবিধ চেষ্টা করে বলে আরো বেশী চঞ্চল হয়ে পড়ে এবং তাতে উপদ্রব আরো বাড়ে এবং মন স্থির হয় না। তাই শ্রী শ্রী ঠাকুর পতিব্রতা ধর্ম্মকে আশ্রয় করে থাকতে আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। পতিব্রতা ধর্ম্মকে আশ্রয় করে ও তাঁর শরণে সর্ব্বদা নিমগ্ন থাকতে হবে। এর জন্য আমাদের সঠিক পথ হল – শ্রীগুরু প্রদত্ত “শ্রী নাম” সর্ব্বদা অহরহ, অনবরত শ্রদ্ধা, ভক্তি, শ্রীগুরুর প্রতি দৃঢ় অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে ও নিষ্ঠা সহকারে জপ করা। এভাবে নিত্য নামের অভ্যাসে শ্রীগুরুর প্রতি সম্পূর্ণ অনুরক্ত হলে ভক্তিরস গাঢ় হবে এবং শ্রীগুরুই যে আমাদের পতি সেই জ্ঞানের উদয় হবে। এভাবে নিজ কর্ম জনিত অপরাধ সকল ক্ষমা প্রার্থনা করতে করতে মনের চঞ্চলতা ধীরে ধীরে স্থিতাবস্থায় আসতে থাকে। প্রকৃতির অর্থাৎ সত্ব, রজ ও তম এ তিন গুণের চঞ্চলতার জন্যই মন স্থির হয় না। তাই যে সকল প্রকৃতির সঙ্গ হয় সেই প্রকৃতির ভাবের নিকট থেকে দূরে থাকবার চেষ্টা করতে করতে চিত্ত সঙ্কোচ হবে, এর জন্য নিজেকে সর্ব্বদা শ্রী নামের জপের মাধ্যমে পতি ভক্তি রসে ডুবে থাকতে হবে এবং পরে যখন মন স্বস্থানে প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে, তখন মন আর কোথাও যাবে না এবং স্থির হয়ে যাবে ও সত্য বস্তুর উপলব্ধি হবে। ফলে সযোগ অর্থাৎ যোগের মাধ্যমে যে সুখ বোধ হয়, ভক্তি যোগে তদপেক্ষা অনেক বেশী সুখের উদয় হবে অর্থাৎ নিত্যানন্দ সুখের রসে ডুবে থাকতে সক্ষম হওয়া যায়। এ অবস্থায় মনকে স্বস্থানে প্রতিষ্ঠা বলে। এ লক্ষ্যে আমাদের পৌঁছতে হবে; তবেই এ মনুষ্য জীবনের সার্থকতা আসবে।
উপসংহার:- উপরোক্ত শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপদেশ থেকে আমাদের শিক্ষনীয় এই যে শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরই আমাদের পতি। এ পতিব্রতা ধর্ম্মকে আশ্রয় করে থাকাকে স্বধর্ম পালন বলা হয়। তাই শ্রী শ্রী ঠাকুরের শ্রী চরণ যুগলে ১০০% অর্থাৎ সম্পূর্ণ সমর্পণ করে শ্রী শ্রী ঠাকুরের উপদেশ বাণী অক্ষরে অক্ষরে পালন করে অর্থাৎ শ্রীগুরু প্রদত্ত “শ্রীনামের” অনুশীলনের মাধ্যমে শ্রীগুরুর প্রতি দৃঢ় অন্ধ বিশ্বাস রেখে শ্রদ্ধা ও ভক্তি এবং ধৈর্য্য সহকারে যদি আমরা এগিয়ে যেতে পারি; তবে শ্রী গুরু কৃপায় মন স্বস্থানে প্রতিষ্ঠা হবে এবং নিত্যানন্দ সুখ রসে ডুবে থাকতে সক্ষম হব।
সকলকে সশ্রদ্ধ প্রনাম, আন্তরিক ভালবাসা এবং শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। জয় রাম। প্রদ্যোৎ কুমার ভৌমিক (চন্দন ভৌমিক্), সম্পাদক, শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর আশ্রম, হরিদ্বার।