সংসার বন্ধন থেকে মুক্তির পথ – ১/৬৫ বেদবাণী।
” সংসারের পথ বহুবিধ রকমে বন্ধন মুক্তির কারণ হয়। তন্মধ্যে দুইটি পথ প্রধান, যাহা দ্বারা উদ্ধার হয়। সকলই অনন্য চিন্তার দ্বারা পরিপুষ্ট হইয়া থাকে। প্রথমটি অকর্ত্তা হওয়া চিন্তা ভাবনা বর্জ্জনে যখন যে অবস্থা উপস্থিত তাহার বেগ সহ্য করা। দ্বিতীয়টি সর্ব্বদা ভগবানকে সখ্য, দাস্য, বাৎসল্য কি মধুর ভাবের যে কোন ভাবের একটিতে মুগ্ধ হইয়া তাহাকে পাবার ঐকান্তিক বাসনায় দিবানিশি সর্ব্বত্রে সকল অবস্থায়ই পাবার লালসা করিয়া থাকিতে হয়। সকল দেবতা প্রভৃতি জীবগণের নিকট অপরাধ ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া ভগবৎ কৃপা ভিক্ষা করিতে হয়। এই দুইটি পথই উদ্ধার করিয়া ভগবৎ সাক্ষাৎ প্রাপ্ত হয়। জন্ম মৃত্যু যায়।” – ১/৬৫ বেদবাণী। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর।
উপরোক্ত শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের বাণীর গুঢ় অর্থ নিম্নে প্রদত্ত হলঃ-
সংসারের বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়ার নানাবিধ পথ আছে। যেমন – শ্রীগুরু চরণ যুগলে সম্পূর্ণ সমর্পণ, শ্রীগুরুর প্রতি দৃঢ় অন্ধ বিশ্বাস রেখে শ্রীগুরু বাক্য পালন করা, ধৈর্য্য ও সহনশীলতার সহিত নিষ্ঠা সহকারে শ্রীগুরু প্রদত্ত শ্ৰীনাম জপ করা ইত্যাদি পথ৷ সংসার বন্ধন থেকে মুক্ত হতে তার মধ্যে দুটি পথ প্রধান এবং তা অনন্য চিন্তার দ্বারাই সবই সম্ভব, অর্থাৎ সব কিছু ছেড়ে দিয়ে একমাত্র নামের চিন্তা বা ভগবান শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের চিন্তাতে মগ্ন থাকলে সংসার থেকে উদ্ধার হওয়া সম্ভব হবে।
(১) অকর্ত্তা অর্থাৎ কর্ত্তৃত্ববিহীন হয়ে চিন্তা ভাবনা বর্জ্জন করে যখন যে অবস্থা উপস্থিত হয় তার বেগ সহ্য করা।
(২) সর্ব্বদা ভগবানকে সখ্য, দাস্য, বাৎসল্য কি মধুর ভাবের যে কোন ভাবের একটিতে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে পাবার ঐকান্তিক বাসনায় দিবানিশি সর্ব্বত্রে সকল অবস্থায়ই পাবার লালসা করে থাকতে হবে। এখানে সখ্য ভাব বলতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুন সম্পর্ক্য বা শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর ও শ্রী শ্রী ঠাকুরের লীলা পার্ষদ শ্রী ফনীন্দ্র মালাকার সম্পর্ক্য।
দাস্যভাব বলতে ভগবান শ্রী রাম ও বীর ভক্ত হনুমান সম্পর্ক্য। বাৎসল্য ভাব বলতে শ্রী কৃষ্ণ ও মা যশোদা সম্পর্ক্য। মধুর ভাব বলতে রাধা ও গোবিন্দ সম্পর্ক্য। উপরোক্ত ভাবের যে কোন একটি পথ বেছে নিলে ভগবান প্রাপ্তি হয় ও সংসার বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ হয়। তবে এর জন্য ভক্তি ভাব রেখে বিণয়ী হয়ে সকল দেবতা প্রভৃতি জীবগণের নিকট নিজ নিজ অপরাধ ক্ষমা প্রার্থনা করে ভগবৎ কৃপা ভিক্ষা করতে হয়। এ দুটি পথই উদ্ধার করে ভগবৎ সাক্ষাৎ প্রাপ্ত হয়; এ অবস্থায় জীবাত্মা পরমাত্মার সঙ্গে লীন হয়ে যায় এবং জন্ম মৃত্যু রহিত হয়।
উপসংহার:- উপরোক্ত শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপদেশ বাণী থেকে আমাদের শিক্ষনীয় এই যে উপরোক্ত দুটি পথের মধ্যে যে কোন একটি পথ বেছে নিতে হবে।
অকর্ত্তা অর্থাৎ কর্ত্তৃত্ববিহীন হয়ে চিন্তা ভাবনা বর্জ্জন করে যখন যে অবস্থা উপস্থিত হয় তার বেগ সহ্য করা।
সর্ব্বদা ভগবানকে সখ্য, দাস্য, বাৎসল্য কি মধুর ভাবের যে কোন ভাবের একটিতে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে পাবার ঐকান্তিক বাসনায় দিবানিশি সর্ব্বত্র সকল অবস্থায়ই পাবার লালসা করে থাকতে হবে। তবে এর জন্য ভক্তি ভাব রেখে বিণয়ী হয়ে সকল দেবতা প্রভৃতি জীবগণের নিকট নিজ নিজ অপরাধ ক্ষমা প্রার্থনা করে ভগবৎ কৃপা ভিক্ষা করতে হবে। এ অবস্থায় শ্রীগুরু কৃপা প্রাপ্ত হলে সংসার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে জীবাত্মা পরমাত্মার সঙ্গে লীন হয়ে যাবে এবং ভগবান প্রাপ্তি হবে। ইহাই আমাদের একমাত্র উদ্ধারের পথ।
সকলকে সশ্রদ্ধ প্রনাম, আন্তরিক ভালবাসা এবং শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। জয় রাম। প্রদ্যোৎ কুমার ভৌমিক (চন্দন ভৌমিক্), সম্পাদক, শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর আশ্রম, হরিদ্বার।
বৈষ্ণব ও ভক্ত – ১/৬৬ বেদবাণী।
“ধীর সমীরে যমুনা তীরে বসতি সতত বনমালী।
ধীরভাবে নাম পুনঃ পুনঃ উচ্চারণ করিতে করিতে ক্রমশঃ বায়ুর স্থিরবর্ত্তী উপস্থিত হয়। তৎপর প্রকাশ পায়, পরে জিতেন্দ্রিয় হয়। ইন্দ্রিয়গণ যে দিকে মনকে কর্ষণ করে সেই দিক হইতে অন্তরালে থাকিবার সতত চেষ্টা করিয়া পুনঃ পুনঃ মনকে ধীর সমীরে রাখার চেষ্টা করিতে হয়। যতই মন চঞ্চল হউক না কেন ততই মনকে ধীর স্থানে রাখিবার চেষ্টা করাই প্রয়োজন। যে সকল বিষয়ে ইন্দ্রিয়গণ প্রলুব্ধ হয় তাহাতে যতই মন আকৃষ্ট হউক না কেন ততই আস্তে আস্তে ধীরের যোগে বশ রাখিবার চেষ্টা করিতে হয়। নির্জ্জন স্থানে বসিয়া ঐ যোগ না করিলে কার্য্য সিদ্ধ হয় না। আর বেশী বাজে আলাপ ব্যবহার করিলেও বাধক অনেক উৎপন্ন হইয়া থাকে। যে পর্য্যন্ত নিদ্রা আকৃষ্ট না হয় সেই পর্য্যন্ত ঐ ধীর সমীরে থাকিতে পুনঃ পুনঃ চেষ্টা করিবেন | কূটস্থ চৈতন্যের আবির্ভাবে নিত্যানন্দের যোগ হয়। ধীর সমীরে যাওয়ার ব্যবস্থাটুকুকে অদ্বৈত ভাব বলিয়া থাকে। এখানে প্রতিষ্ঠা রুচি জন্মিলে যে ভাব হয় তাহাকে গদাধর বলে। সতত এই স্থানে আবেগবৃত্তি বর্দ্ধন শক্তিকে শ্ৰীবাস বলে। এই স্থান ছাড়িয়া অন্য কোনো স্থানে মনের গতি এবং কোন কামনা বাসনা না আসে তাহাকে যোগস্তু বলে। এই পরিচর্য্যার প্রতি যে পিপাসা এবং পাওয়ার জন্য যে ব্যগ্রতা অধিক হয় তাহাকে বৈষ্ণব বলে। সতত ইহারই পরিচর্যাকারী চিত্তকে ভক্ত বলে জানিবেন।” – ১/৬৬ বেদ বাণী। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর।
উপরোক্ত শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের বাণীর গুঢ় অর্থ নিম্নে প্রদত্ত হলঃ-
ধীর সমীরে যমুনা তীরে বসতি সতত বনমালী।
এটি বিখ্যাত কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ কাব্যের বিখ্যাত লাইন। এ টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর কি বুঝাতে চেয়েছেন তা আমাদের গভীরে প্রবেশ করে উপলব্ধি করতে হবে।
আপনারা সবাই জানেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যমুনা নদীর তীরে তাঁর যাবতীয় লীলা করেছেন। এখানে বনমালী বলতে স্বয়ং শ্রী কৃষ্ণ ও যমুনার তীরেই সর্বদা বিচরণ করতেন। সমীর অর্থ বাতাস। নদীর ধারে যখন মৃদু মন্দ বাতাস বইতে থাকে তখন প্রাণ জুড়িয়ে যায়। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর বলছেন যে এ বাতাস হল প্রাণ। যে নাম আমরা পেয়েছি, সে শ্রী নাম প্রাণেরই খেলা অর্থাৎ বাতাস ভিতরে নিচ্ছি আবার ছাড়ছি যাকে আমরা স্বাস প্রশ্বাস বালি। ধীরভাবে নাম পুনঃ পুনঃ উচ্চারণ করতে করতে ক্রমশঃ বায়ুর স্থিরবর্ত্তী উপস্থিত হবে। তারপর বিকশিত হবে এবং, পরে জিতেন্দ্রিয় হবে। ইন্দ্রিয়গণ যে দিকে মনকে কর্ষণ করে সে দিক থেকে অন্তরালে অর্থাৎ নিরিবিলি থাকার সতত চেষ্টা করে পুনঃ পুনঃ মনকে ধীর সমীরে রাখার চেষ্টা করতে হয়। যতই মন চঞ্চল হউক না কেন ততই মনকে ধীর স্থানে রাখার চেষ্টা করাই প্রয়োজন। যে সকল বিষয়ে ইন্দ্রিয়গণ প্রলুব্ধ হয় অর্থাৎ ইন্দ্রিযগণ নানা প্রলোভনে ধাবিত হয় তাতে যতই মন আকৃষ্ট হউক না কেন ততই আস্তে আস্তে ধীরের যোগে বশ রাখবার চেষ্টা করতে হবে। নির্জ্জন স্থানে বসে ঐ যোগ না করলে কার্য্য সিদ্ধ হয় না। আর বেশী বাজে বিষয়ে আলাপে মেতে থাকলে অনেক রকম বাধা বিঘ্নের উৎপত্তি হয়। তাই যে পর্য্যন্ত নিদ্রা আকৃষ্ট না হয় সে পর্য্যন্ত ঐ ধীর সমীরে থাকতে পুনঃ পুনঃ চেষ্টা করতে হবে। কূটস্থ চৈতন্যের অর্থাৎ বিশুদ্ধ চেতনার আবির্ভাবে নিত্যানন্দের যোগ হয়। ধীর সমীরে যাওয়ার ব্যবস্থাটুকুকে অদ্বৈত ভাব বলে অর্থাৎ একটাই ভাব (এখানে শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরই আমাদের ভগবান; ইহাই অদ্বৈত ভাব)। এখানে প্রতিষ্ঠা রুচি জন্মিলে অর্থাৎ নামের প্রতিষ্ঠা হলে অনুরাগ বেড়ে নামে রুচি হলে যে ভাব হয় তাকে গদাধর বলে অর্থাৎ তাকে পূর্নাঙ্গ জ্ঞানী বলা হয়। সতত এ স্থানে আবেগবৃত্তি অর্থাৎ শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরকে পাবার আবেগ বর্দ্ধন শক্তিকে শ্ৰীবাস বলে অর্থাৎ ভগবানেতে বাস বলে। তাই এ স্থান ছেরে অন্য কোনো স্থানে মনের গতি এবং কোন কামনা বাসনা স্পর্শ করতে পারে না বলে তাকে যোগস্তু বা পরমাত্মার সঙ্গে যোগ বলে। এ পরিচর্য্যার প্রতি যে পিপাসা এবং পাওয়ার জন্য যে ব্যগ্রতা অধিক হয় তাকে বৈষ্ণব বলে। সতত ইহারই পরিচর্যাকারী চিত্তকে ভক্ত বলে। অতএব উপরোক্ত আধ্যাত্মিক জগতে শুরু থেকে সর্ব্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পারলে বৈষ্ণব ও ভক্ত হওয়া যায়।
উপসংহারঃ-
তাই আসুন আমরা শ্রী গুরু আজ্ঞা অক্ষরে অক্ষরে পালন করি। শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের উপদেশ অনুযায়ী শ্রী গুরু প্রদত্ত শ্রী নাম সর্বদা যে কোন অবস্থায় অহরহ অনবরত শ্রদ্ধা, ভক্তি, শ্রী গুরু প্রতি দৃঢ় প্রত্যয় অন্ধ বিশ্বাস ও নিষ্ঠা সহকারে জপ করতে করতে স্থির অবস্থা আসবে অর্থাৎ শ্বাস প্রশ্বাস নেওয়া ও ত্যাগ বন্ধ হয়ে যাবে। এ ভাবে ভিতর থেকে কূল কুণ্ডলিনী শক্তির জাগরণ হবে এবং ভগবানের জ্যোতির্ময় রূপ দর্শন হবে। তারপর গভীরে প্রবেশ করলে বিশুদ্ধ ভক্তি, পরে অতি বিশুদ্ধ ভক্তি ও প্রেম, বিশুদ্ধ প্রেম এবং অবশেষে অতি বিশুদ্ধ প্রেমের উদয় হবে। ঐ অবস্থায় যদি কোন ভক্ত আধ্যাত্মিক এর উচ্চ শিখরে পৌঁছতে পারেন, তখন তার জন্ম মৃত্যু রহিত হবে। জীবাত্মা ভক্ত পরমাত্মার সঙ্গে লীন হয়ে যাবে। এ অবস্থাকে বৈষ্ণব ও ভক্ত বলে।এই লক্ষ্যে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন, আবার অসম্ভব কিছু নয়। শ্রী গুরু কৃপা প্রাপ্ত না হলে ভগবানের ঐ গন্তব্য স্থলে পৌঁছান যায় না। প্রত্যেক ভক্তের প্রতি শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের এটাই পরম নির্দেশ যে যাতে আমরা শ্রী নাম সর্বদা যে কোন অবস্থায় অহরহ অনবরত শ্রদ্ধা, ভক্তি, দৃঢ় প্রত্যয় অন্ধ বিশ্বাস ও নিষ্ঠা সহকারে জপ করি। তাতে আমরা এক জন্মে ভগবানের গন্তব্য স্থলে না পৌঁছতে পারলেও অন্ততঃ পক্ষে আধ্যাত্মিক উন্নতি অবশ্যই হবে। তাই শ্রী গুরু বাক্য পালনই আমাদের শিরোধার্য ও ইহাই পরম ধর্ম এবং স্বধর্ম পালন করা বলে।
সকলকে সশ্রদ্ধ প্রণাম, আন্তরিক ভালবাসা এবং শুভেচ্ছা জানাই। প্রদ্যোৎ কুমার ভৌমিক (চন্দন ভৌমিক), সম্পাদক, শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর আশ্রম, হরিদ্বার।